ব্যবসায়ীরা গ্যাসের বাড়তি দাম দিলেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাননি। অন্তর্বর্তী সরকার গ্যাসের বিদ্যমান সংযোগে দাম না বাড়ালেও সম্প্রতি শিল্প ও ক্যাপটিভের নতুন সংযোগে ৩৩ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে। অন্যদিকে দেশের গ্যাস খাতে হয়ে আসা অপচয়-চুরি কমেনি, গ্যাস সরবরাহও বাড়েনি। এর পরও এ মূল্যবৃদ্ধি দেশে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে এবং অসম প্রতিযোগিতা বাড়াবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় সরকার গ্যাস আমদানি করছে। আর আমদানি ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান কমাতে দাম বাড়াচ্ছে। অথচ গ্যাস খাতে বিপুল পরিমাণ চুরি ও দুর্নীতি কমাতে পারছে না। গ্যাস খাতে আর্থিক ক্ষতির বড় কারণ সিস্টেম লস, চুরি ও দুর্নীতি। এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কোনো সরকারেরই জোরালো তদারকি ছিল না। এ কারণে বছরের পর বছর গ্যাস খাতের আর্থিক ক্ষতি কমাতে শিল্প-বিদ্যুৎসহ নানা খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
অবশ্য জ্বালানি বিভাগসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্প ও ক্যাপটিভের নতুন সংযোগে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি মূল্যের তুলনায় সামান্য। এটি বিদ্যমান শিল্প ও ক্যাপটিভ সংযোগে খরচ বাড়াবে না। যারা নতুন সংযোগ নিতে চান তাদের জন্য একটা বিকল্প অপশন তৈরি করা হয়েছে। কেউ এ দামে গ্যাস নিতে না চাইলে এলপিজি কিংবা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করতে পারেন।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১৯৯০ সালের পর থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৫ দফা। এ সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে (সরকারি-বেসরকারি) ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের দাম ১ টাকা ৩৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা পর্যন্ত। শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ঘনমিটারপ্রতি ১ টাকা ৩৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে বিগত সাড়ে তিন দশকে সর্বোচ্চ ৪২ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে যথাক্রমে ১৭ ও ১৯ দফা।
দেশে অব্যাহতভাবে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতকে সংকুচিত করছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে শিল্প অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা এ খাত থেকে ছিটকে পড়েছেন। নতুন সংযোগে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্পে বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন শিল্পে গ্যাসের ৩৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই)। গ্যাসের নতুন মূল্যহারকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, নতুন গ্রাহক, প্রতিশ্রুত গ্রাহক ও বিদ্যমান গ্রাহকের গ্যাসের দর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভিন্ন ভিন্ন গ্যাসের দর এ খাতের বেশকিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। জ্বালানির ভিন্ন দামের কারণে উৎপাদন খরচে পার্থক্য তৈরি করবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি তৈরি করবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগেও।
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে বিভ্রান্তিকর, বৈষম্যমূলক ও অন্যায় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ব্যবসায়ী সংগঠন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ। সংগঠনটি গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণ মডেলটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগেও বাধা সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় আগে কমাতে হবে। এগুলো চালু রেখে গ্যাসের দাম কখনই কমানো সম্ভব নয়। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি খাতের চুরি-দুর্নীতি মোকাবেলা করতে হবে। এগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সব সরকার এ দেশের উৎপাদন খাতকে পঙ্গু করে ফেলেছে। এখনো সেই কাজ অব্যাহতভাবে চলছে। এতে ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।’
দেশে গ্যাসের মজুদ ক্রমেই কমে আসছে। এ সংকট মোকাবেলায় বিগত দেড় দশকে স্থানীয় গ্যাস খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বরং গ্যাসের সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিকে সমাধান হিসেবে দেখেছে আওয়ামী লীগ সরকার। সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে দেখা গেছে, ২০২০ সালের এপ্রিলে স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। পাঁচ বছর পর স্থানীয় সরবরাহ সেই একই জায়গায় আটকে রয়েছে। অথচ এ সময়ে দেশে অন্তত দুই হাজার ঘনফুট গ্যাসের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ চাহিদা মোকাবেলায় স্পট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি অব্যাহত রেখেছে সরকার। ২০১৮ সালের পর থেকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সেই সঙ্গে এ খাতে প্রতি বছর ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৫-৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে এলএনজিতে ভর্তুকি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশে গ্যাস খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ চুরি ও অপচয়। প্রতি বছর যে পরিমাণ গ্যাস সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয় তার অধিকাংশই চুরি বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার অন্তত দুজন কর্মকর্তা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তারা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের চুরি যাওয়া বড় অংশ সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয়। এ গ্যাস একটি চক্র বিগত সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের মাধ্যমে চুরি করে অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। এ চুরি পেট্রোবাংলার রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।’
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের বাস্তবতাটা বুঝতে হবে। এখন আর যত্রতত্র গ্যাসের সংযোগ দেয়ার সুযোগ নেই। আমাদের গ্যাসের মজুদ কমে আসছে, সরবরাহ ঠিক রাখতে আমদানি বাড়ছে। ফলে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে কম মূল্যে বিক্রি করার সুযোগ কোথায়? গ্যাসের যতটুকু দাম বেড়েছে এটা সামান্য এবং নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে এ দাম বেড়েছে। এখন এ প্রাইসে গ্যাস নিয়ে কোন খাতে ব্যবহার করলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন এবং কোন টেকনোলজি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবে, সেটা কিন্তু এ প্রাইসে (মূল্যবৃদ্ধি) একটা বার্তা দেবে।’
দেশের সব সরকারই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু এ খাতের চুরি-দুর্নীতি কমানো যায়নি—এ প্রসঙ্গে জ্বালানি উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘গ্যাস চুরির ক্ষেত্রে আমরা প্রতিনিয়ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছি। কিন্তু কেটে দেয়া সংযোগগুলো পুনরায় জোড়া লাগছে। এ সংযোগ যাতে আর জোড়া লাগতে না পারে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করছি। কোম্পানিগুলো সিস্টেম লস ও চুরি নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।’